বুধবার, ১৭ জুলাই, ২০১৩

নিঃসন্তান নারীর মাতৃত্ব ভাবনা

মা কথাটি সবার কাছেই সবচেয়ে মধুর, সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী শব্দ কবি যেমনটি বলেছেন, `মা বলিতে প্রাণ, করে আনচান, চোখে আসে জল ভরে।` মাকথাটি বলতে যেমন মানুষের মনে প্রচন্ড আগ্রহ তেমনিমাকথাটি শুনতেও প্রত্যেকটি নারীর মনের গভীরে একটা স্বপ্ন লালিত হয় নারী জাতী নিজের অজান্তেই প্রকৃতিগতভাবে এই স্বপ্ন লালন করে যখন সে বড় হয়, বুঝতে শেখে, তখন হয়তো তা বুঝতে পারে কিন্তু এই বুঝতে পারাটা আবার সবার জীবনে সমানভাবে আসে না আমরা যারা আগাছার মতো জন্ম লই এবং বড় হই তাদের মনে এই বোধটি এতোই হালকাভাবে আসে যে তা আমরা নিজেরা কখনও যেনো বুঝতেই পারি না কিন্তু যারা এর ব্যতিক্রম তারা বিষয়টা বুঝেন হাড়ে হাড়ে আর তারা হলো সমাজের সেই সব মানুষ যারা জীবন দিয়ে হলেও চায় বাবা বা মা হতে কিন্তু কোন এক জ্ঞাত বা অজ্ঞাত কারনে তাদের আর তা হওয়া হয়ে উঠে না তারা সমাজে কখনও আটখুরা, কখনও বন্ধা, কখনও নিঃসন্তান (Childless) হিসাবে পরিচিত হয় একজন নিঃসন্তান মানুষের চোখে তাই মাতৃত্ব শব্দটি অবশ্যই ভিন্ন মাত্রা যোগ করে

মা মাতৃত্বের আভিধানিক অর্থ

আমরা মা (Mother) শব্দটির অর্থ খোঁজ করে যা পেয়েছি-
(1) মাতা, জননী, প্রসূতি, জনয়িত্রী, জন্মদাত্রী, a female parent of a child or animal,
(2)
ধাত্রী, foster-mother, any woman to be regarded as one’s mother or daughter,
a person who is acting as a mother to a child,
(3)
আবাসিক বিদ্যালয় শিশুসদন ইত্যাদিতে শিশুদের দায়িত্বে নিয়োজিত মহিলা (প্রায়শ Housemother), পালয়িত্রী, পালিকা, মেয়েদের ধর্ম প্রতিষ্ঠানের প্রধান, আশ্রমপালিকা, a matron, the title of a woman who is head of a CONVENT,
এবং মাতৃত্ব (Motherhood) শব্দটির আভিধানিক অর্থ পেয়েছি-
State of a mother, is the state of being a mother,
Mothering শব্দটির আভিধানিক অর্থ পেয়েছি-
If you mother someone, (i) you look after them and bring them up, usually when you are their mother, (ii) You treat them with great care and affection, and often spoil them, (iii) to care sb/sth because you are their mother, or as if you were their mother, (iv) to adopt or treat as a son or daughter, (v) the act of caring for and protecting children art her people

নিঃসন্তান নারীর দৃষ্টিতে মা মাতৃত্বের সংঙ্গা।

যেকোন কারনে যেকোন সময় একজন নারী নিঃসন্তান হয়ে যেতে পারে কেউ হয়তো কখনো সন্তান গর্ভে ধারন করেননি কেউ আবার গর্ভে ধারন করলেও কোন কারনে জীবিত সন্তান লাভ করতে পারেননি কারো সন্তান জীবিত জন্মের পার মারা গেছে বাংলাদেশে গর্ভে বা সন্তান জম্নের পর মৃত্যুর হার অনেক বেশী তারপর আসে প্রাপ্ত বয়স্ক বা অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানের মৃত্যু সবার জীবনের ঘটনা একভাবে ঘটেনা কিন্তু ঘটনা যেভাবই ঘটুক নিঃসন্তান নারী বুঝে সন্তান না পাবার জ্বালা অথবা সন্তান হারানোর যন্ত্রনা মা কথাটি তাই তাঁদের কাছে বড় বেদনার, বড় হতাশার, বড়ই তিক্ত অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ তাই বলে কোন নিঃসন্তান নারী এমনকি কোন সাধারণ বোধ সম্পন্ন সুস্থ মানুষ কখনই কোন নিঃসন্তান নারীকে মাতৃত্বহীন বলতে পারবে না মাতৃত্ব শব্দটির মাঝে আমরা মায়া-মমতা-ভালোবাসার এক অকৃত্রিম ছায়া দেখতে পাই মাতৃত্ব এক ব্যাপক পরিভাষা যার সংঙ্গা দিয়ে শেষ করা যায় না মাতা, জননী, প্রসূতি, জনয়িত্রী, জন্মদাত্রীর মাঝে আমরা যেমাতৃত্বদেখেছি সেই একই মাতৃত্বদেখেছি ধাত্রী, পালয়িত্রী, পালিকা, আশ্রমপালিকা, আবাসিক বিদ্যালয় শিশুসদন ইত্যাদিতে শিশুদের দায়িত্বে নিয়োজিত মহিলাদের মাঝে যারা তার অপূর্ণ ভালোবাসার সবটুকু উজার করে অন্যের জন্মদেয়া শিশুদের লালন-পালন করে শিক্ষা-দিক্ষায় বড় করে তোলেন আমাদের প্রিয় নবি হযরত মোহাম্মদ (সঃ) যেমন মাতৃত্ব পেয়েছেন তাঁর দুধমাতা হালিমার কাছ থেকে হাজার হাজার এতিম সন্তানেরা যে মাতৃত্ব পেয়ে বড় হচ্ছে হাজার হাজার এতিমখানায় অথবা নিকটাত্নিয়ার কাছে অথবা নিতান্তই অপরিচিত কোন মানুষের ঘরে আমরা এই সব মহান মানুষদের মাতৃত্বকে স্রদ্ধা জানাই আমরা তো দেখেছি হিংস্র বাঘও মানব শিশুকে দুধ খাওয়াচ্ছেন আমরা কি বনের এই হিংস্র পশুর এই মাতৃত্বকে কোনভাবে অবহেলা বা অস্বীকার করতে পারি? পারিনা তাহলে সেখানে মাতৃত্বের সম্পূর্ণ ভান্ডার নিয়ে যে নারী অতৃপ্ত ও জ্বালাময় জীবনের যাতনা বয়ে বেড়াচ্ছে তাকে আমরামাতৃত্বহীনবলে গালি দেই কিভাবে? মাতৃত্ব বলতে তাই আমরা বুঝবো মায়ের দায়িত্ব পালনের সামর্থ, সন্তান গ্রহণের সামর্থ, সন্তান লালন-পালনের সামর্থ, শিশুদের প্রতি ভালোবাসা, মমতা, যেকোন শিশু বা প্রাণির প্রতি স্নেহময় অনুভুতি আমরা তো দেশকে মাতা হিসেবে গণ্য করে দেশমাতা বলেছি অনেক হিন্দুকে মা বলে দেব-দেবী বা প্রভূকে বুঝান আর আমরা কি এতোই মুর্খ, এতোই অন্ধ যে শুধু জীবনের কোন এক দুর্ঘটনার জন্য যে নারী তার সন্তান হারিয়েছেন তাঁর মাতৃত্বকে আমরা অস্বীকার করবো? তাহলে তো আমরা আমাদের নিজেদের মাকেই অস্বীকার করাছি কারন আমাদের মরন আল্লাহর ইচ্ছায় যেকোন সময় হতে পারে আর তখন আমার মাও নিঃসন্তান হয়ে যেতে পারেন

মায়ের দায়িত্ব:

() শিশু জন্মের পূর্বের দায়িত্ব
আমরা সহজেই বুঝে যাই শিশু জন্মের পূর্বে মায়ের কিকি দায়িত্ব থাকে যেমন- পরিকল্পিত গর্ভধারন, গর্ভসংরক্ষন, গর্ভের সন্তানের সঠিত পরিচর্যা, পরিকল্পিত সন্তান প্রসব
পবিত্র কোরআনে যেমনটি নির্দেশনা পাওয়া যায়,
(
) আর আমরা মানুষকে তার পিতামাতার সম্পর্কে নির্দেশ দিয়েছি -- তার মাতা তাকে গর্ভে ধারণ করেছিলে কষ্টের উপরে কষ্ট করে, আর তার লালন-পালনে দুটি বছর, -- এই বলে -- ''আমার প্রতি ও তোমার পিতামাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো। আমারই নিকটে প্রত্যাবর্তনস্থান। (সুরা লুকমান:১৪)
() বলো -- ''এসো আমি বাতলে দিই তোমাদের প্রভু তোমাদের জন্য কি নিষেধ করেছেন, -- তোমরা তাঁর সঙ্গে অন্য কিছু শরিক করো না, আর পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার, আর তোমাদের সন্তানদের তোমরা হত্যা করো না দারিদ্রের কারণে,’’ -- আমারাই জীবিকা দিই তোমাদের ও তাদেরও, -- ''আর অশ্লিলতার ধারে-কাছেও যেও না তার যা প্রকাশ পায় ও যা গোপন থাকে, আর তেমন কোনো লোককে হত্যা করো না যাকে আল্লাহ্ নিষেধ করেছেন, -- যথাযথ কারণ ব্যতীত। এইসব দিয়ে তিনি তোমাদের আদেশ জারি করেছেন, যেন তোমরা বুঝতে পারো। (সুরা আল-আনআম:১৫১)
() শিশু জন্মের পরের দায়িত্ব
আমরা সন্তান জন্মানোর পরের দায়িত্ব সম্পর্কে বলতে পারি শিশুকে প্রথমত- বুকের দুধ পান করানো, প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত খাবার দেয়া, শিশুর সব ধরনের সেবা-যত্ন করা, লালন-পালন করা, বড় হতে যা যা দরকার সব কিছুর ব্যবস্থা করা এমনকি যে শিশুর পরিচয় দেয়া, খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান ও শিক্ষা-দিক্ষার ব্যবস্থা করা একটি শিশুকে স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে বড় করে একটি পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সকল দায়িত্বই পিতা-মাতার পিতার অবর্তমানে মাতাই সকল দায়িত্ব পালন করবে মাতৃত্বের এই দায়িত্ব মাতা বা জন্মদাত্রী কখনই অস্বীকার করতে পারবে না
পবিত্র কুরআনে বিষয়টি এভাবে বলা হয়েছে, ‘আর মায়েরা নিজ সন্তানদের পুরো দুবছর স্তন্য খেতে দেবে, -- যে চায় স্তন্যদান পুরো করতে। তার পিতার উপরে দায়িত্ব তাদের খাওয়ানো ও পরানো ন্যায়সঙ্গতরূপে। কোনো লোকেরই উচিত নয় এমন দায়িত্ব আরোপ করা যা তার ক্ষমতার অতিরিক্ত। মাতাকেও যেন সন্তানের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে না হয়, আর যার রসে সন্তান জন্মেছে তাকেও যেন নিজের সন্তানের দরুন, আর উত্তরাধিকারীর উপরে দায়িত্ব তার অনুরূপ করা। কিন্তু যদি দুজনেই ইচ্ছা করে মাই ছাড়াতে, উভয়ের মধ্যে সম্মতিক্রমে এবং পরামর্শক্রমে, তবে তাদের কোনো অপরাধ হবে না। আর যদি তোমরা চাও তোমাদের সন্তানদের জন্য ধাইমা নিযুক্ত করতে, তাতেও তোমাদের কোনো অপরাধ হবে না যে পর্যন্ত তোমরা রাজী থাকো যা তোমরা পুরোদস্তুর প্রদান করবে। আর আল্লাহ্‌কে ভয়ভক্তি করবে, আর জেনে রেখো -- নিঃসন্দেহ তোমরা যা করো আল্লাহ্ তার দর্শক।’ (সুরা আল-বাকারা-/২৩৩)

সন্তান জন্মদান কি মানুষের হাতে?

আল্লাহ তায়ালা আমাদের স্রোষ্টা বিশ্বজগতে যা কিছু আছে তার একমাত্র স্রোষ্টা তিনি আমরা অনেকেই ভুলে যাই যে, আমার যিনি স্রোষ্টা তিনিই আমার সন্তানেরও স্রোষ্টা সুতরাং আমরা কেউ বলতে পারি না যে আমি একটা ছেলে জন্ম দিব বা একটা মেয়ে জন্ম দিব একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছায়ই জগতের সকল কিছুর সৃষ্টি যেমনটি পবিত্র কোরআনে ঘোষনা এসেছে,
অথবা তিনি তাদের জোড়ে দেন পুত্রসন্তান ও কন্যা-সন্তান, আবার যাকে চান তাকে তিনি বন্ধ্যা বানিয়ে দেন। নিঃসন্দেহ তিনি সর্বজ্ঞাতা, সর্বশক্তিমান। (সুরা আশ-শুরা:৫০)
সুতরাং কার পূত্র-সন্তান হবে, কার কন্যা-সন্তান হবে আর কে বন্ধা হবেন অর্থাৎ নিঃসন্তান হবেন তার ফায়সালা একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই করে থাকেন।
ঘটনা-: এ ব্যাপারে কোরআনে বর্ণিত হযরত যাকারিয়া (আঃ) এর ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। হযরত যাকারিয়া (আঃ) যখন দেখলেন মারিয়ামের কাছে প্রতিদিন নতুন নতুন তাজা ফল-ফলাদি ও খাদ্য-খাবার আসে। তিনি তখন মারিয়ামকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে মারিয়াম বললেন, ‘এসব আল্লাহর নিকট খেকে আসে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বেহিসেব রিযিক দান করেন। (সুরা আলে ইমরান ৩/৩৭)
সম্ভবত শিশু মারিয়ামের উপরোক্ত কথা থেকেই নিসন্তান বৃদ্ধ যাকারিয়ার মনের কোনে আশার সঞ্চার হয় এবং চিন্তা করেন যে, যিনি মৌসুম ছাড়াই মারিয়ামকে তাজা ফল সরবরাহ করেছেন, নিশ্চয়ই তিনি বৃদ্ধ দম্পতিকে সন্তান দান করবেন। অতঃপর তিনি বুকে সাহস বেঁধে আল্লাহর নিকটে প্রার্থনা করেন। যেমন আল্লাহ বলেন,
সে বললঃ হে আমার পালনকর্তা আমার অস্থি বয়স-ভারাবনত হয়েছে; বার্ধক্যে মস্তক সুশুভ্র হয়েছে; হে আমার পালনকর্তা! আপনাকে ডেকে আমি কখনও নিরাশ হইনি। আমি ভয় করি আমার পর আমার স্বগোত্রকে এবং আমার স্ত্রী বন্ধ্যা; কাজেই আপনি নিজের পক্ষ থেকে আমাকে এক জন কর্তব্য পালনকারী দান করুন। (সুরা মারিয়াম ১৯/-)
জবাবে আল্লাহ বললেন, ‘হে যাকারিয়া, আমি তোমাকে এক পুত্রের সুসংবাদ দিচ্ছি, তার নাম হবে ইয়াহইয়া। ইতিপূর্বে এই নামে আমি কারও নাম করণ করিনি। সে বললঃ হে আমার পালনকর্তা কেমন করে আমার পুত্র হবে অথচ আমার স্ত্রী যে বন্ধ্যা, আর আমিও যে বার্ধক্যের শেষ প্রান্তে উপনীত। তিনি বললেনঃ এমনিতেই হবে। তোমার পালনকর্তা বলে দিয়েছেনঃ এটা আমার পক্ষে সহজ। আমি তো পুর্বে তোমাকে সৃষ্টি করেছি এবং তুমি কিছুই ছিলে না।’ (সুরা মারিয়াম ১৯/-)
কুরআনে বর্ণিত এ ঘটনা থেকে জানা যায় আল্লাহ তায়ালার জন্য সব কিছুই করা সহজ আর আমাদের উচিত নিজের ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সমর্পন করা সন্তান লাভের জন্য আমরা যেমন আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভর করব তেমনি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেহোক সেটা সমস্যার অথবা সাফল্যের, আমরা কেবল তাঁরই ইচ্ছার উপর সন্তুষ্ট থাকব
ঘটনা-: এছাড়াও হযরত ইবরাহীম () এর কাহিনীও প্রনিধানযোগ্য ঘটনাটি পবিত্র কুরআনে এভাবে বর্ণিত হয়েছে,
আর অবশ্যই আমার প্রেরিত ফেরেশতারা ইব্রাহীমেরে কাছে সুসংবাদ নিয়ে এসেছিল তারা বলল সালাম, তিনিও বললেন-সালাম। অতঃপর অল্পক্ষণের মধ্যেই তিনি একটি ভুনা করা বাছুর নিয়ে এলেন! কিন্তু যখন দেখলেন যে, আহার্য্যের দিকে তাদের হস্ত প্রসারিত হচ্ছে না, তখন তিনি সন্ধিগ্ধ হলেন এবং মনে মনে তাঁদের সম্পর্কে ভয় অনুভব করতে লাগলেন। তারা বলল-ভয় পাবেন না। আমরা লূতের কওমের প্রতি প্রেরিত হয়েছি। তাঁর স্ত্রীও নিকটেই দাড়িয়েছিল, সে হেসে ফেলল। অতঃপর আমি তাকে ইসহাকের জন্মের সুখবর দিলাম এবং ইসহাকের পরের ইয়াকুবেরও। সে বলল-কি দুর্ভাগ্য আমার! আমি সন্তান প্রসব করব? অথচ আমি বার্ধক্যের শেষ প্রান্তে এসে উপনীত হয়েছি আর আমার স্বামীও বৃদ্ধ, এতো ভারী আশ্চর্য কথা। তারা বলল-তুমি আল্লাহর হুকুম সম্পর্কে বিস্ময়বোধ করছ? হে গৃহবাসীরা, তোমাদের উপর আল্লাহর রহমত ও প্রভুত বরকত রয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ প্রশংসিত মহিমাময়।’ (সুরা হুদ-১১/৭০-৭৩)
নবি ইবরাহীমের (আঃ) কাছে ফেরেশতারা যখন এই সুসংবাদ নিয়ে এলেন তখন তাঁর স্ত্রী সাহারার বয়স অনূন্য ৯০ বছর আর ইরবাহীমের ১০০ বছরসাহারা নিজেকে বন্ধ্যা মনে করতেন এবং সেকারনে সেবিকা হাজেরাকে স্বামীর সাথে বিবাহ দিয়েছিলেন সন্তান লাভের আশায়। অথচ সেই ঘরে ইসমাঈল জন্মের পরেও তাকে তার মা সহ মক্কায় নির্বাসনে রেখে আসতে হয় আল্লাহর হুকুমে। ফলে সংসার ছিল আগের মতোই নিরানন্দময়। কিন্তু আল্লাহর কি অপূর্ব লীলা! তিনি শুষ্ক নদীতে বান ডাকতে পারেন। তাই নিরাশ সংসারে তিনি আশার বন্যা ছুটিয়ে দিলেন। যথাসময়ে ইসহাকের জন্ম হল। যিনি পরে নবী হলেন এবং তাঁরই পুত্র ইয়াকুবের বংশ ধারায় ঈসা পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হাজার হাজার নবী প্রেরিত হলেন। ফলে হতাশ ও বন্ধ্যা নারী সারাহ এখন কেবল ইসহাকের মা হলেন না, বরং তিনি হলেন হাজার হাজার নবীর মা বা উম্মুল আম্বিয়া
এই ঘটনাটি আমাদের কাছে আজব ব্যাপার বলেই মনে হয়। কিন্তু আল্লাহই যে সকল কিছুর স্রোষ্টা তা স্মরণ রাখলে আর আশ্চর্য হতে হয় না। আল্লাহ তায়ালা ইচ্ছা করলে মরা গাছেও ফুল ফোটাতে পারেন আর বৃদ্ধ মানুষকেও সন্তান দিতে পারেন কাজেই আমরা নিজেরা সন্তানের জন্মদাতা বলে গর্ববোধ করতে পারি না।

নি:সন্তান দম্পতিরা কি বঞ্চিত, না আশির্বাদ প্রাপ্ত?

আমরা কিছুতেই সন্তানকে চুড়ান্ত আশির্বাদ হিসেবে বিবেচনা করতে পারি না। বরং ভাবতে হবে আমরা আল্লাহর একটি নেয়ামত প্রাপ্ত কিন্তু সেই সাথে সাথে আমাদের দায়িত্বের কথাও মাথায় রাখতে হবে। কারন আপনার সন্তান আপনার বেহেস্তের ওছিলা যেমন হতে পারে তেমনি দোযখের কারনও হতে পারে। বর্তমান জামানায় ন্যায় পরায়ন ও ধার্মিক সন্তান রেখে যাওয়া খুবই কঠিন। কারন আপনার সন্তান আপনার জন্য কতটা আশির্বাদ আর কতটা অভিশাপ তা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেনহ্যাঁ, আপনি আপাততঃ চক্ষু জুরানোর শান্তি পেতে পারেন কিন্তু কি খবর আখেরাতের? কারন সেদিন কেউ কারো কোন কাজে আসবে না।
যেমনটি আল্লাহ তায়ালা কোরআনে বলেছেন,
ওহে মানবজাতি! তোমাদের প্রভুকে ভয়-ভক্তি করো, আর সেই দিনকে ভয় করো যখন কোনো পিতা তার সন্তানের কোনো কাজে আসবে না, আর না কোনো সন্তানের ক্ষেত্রেও যে সে কোনোও ব্যাপারে কার্যকর হবে তার পিতামাতার জন্যে। নিঃসন্দেহ আল্লাহ্‌র ওয়াদা চিরন্তন সত্য, সেজন্যে এই দুনিয়ার জীবন যেন তোমাদের প্রবঞ্চনা না করুক।’ (সুরা লুকমান ১৩/৩৩)
আমরা যদি ধর্মপরায়ণ সন্তান রেখে যেতে না পারি তাহলে নিঃসন্দেহে আমরা অভিশপ্তদের অন্তর্ভূক্ত হবো। পক্ষান্তরে নিঃসন্তান দম্পতিদের এরূপ ক্ষতির আশঙ্কা নেই।

নি:সন্তান নারী কি মাতৃত্বহীন?

মাতৃত্ব বলতে আমরা মায়ের ভূমিকা বা দায়িত্বকে বুঝি মায়ের দায়িত্বকে আমরা ইতোপূর্বে দুভাগে ভাগ করেছি শিশু জম্নের পূর্বের দায়িত্ব শিশু জম্নের পরের দায়িত্ব নিঃসন্তান নারীরা শিশু জম্নদানে যেকোন ভাবে অক্ষম হলেও শিশুর জন্মের পরের সকল দায়িত্ব পালনে যেকোন সাধারন নারীর মতোই সক্ষম মায়ের মত মমতা, ভালোবাসা দিয়ে শিশুকে লালন-পালন করা, শিক্ষা-দিক্ষায় বড় করা, সাস্থগত পরিচর্যা করা কোন কিছুতেই তাঁদের কোন ঘাটতি নেই যারা নিঃসন্তান কোন নারীকে মাতৃত্বহীন ভাবে বা বলে তার মতো মুর্খ আর নাই এরূপ বলা তার অজ্ঞতারই পরিচয় বরং আমরা অনেক ক্ষেত্রেই জন্মদাতা পিতা-মাতার চেয়ে নিঃসন্তান দম্পতিদের মধ্যে শিশুর প্রতি ভালোবাসা বেশী দেখতে পাই একজন মানুষ বাস্তবজীবনে কোন কারনে সন্তানহীন হলেও মনের জগতে সে সন্তানহীন নয় বরং সন্তানকে কাছে না পাওয়ার কারনে মনের মধ্যে তার সব সময়ই সন্তানের উপস্থিতি উপলব্ধি করে আর তার কারনেই তার জীবন-বোধ হয় আরও উন্নত এই উন্নত জীবন-বোধ থেকেই তার মাতৃত্বের উৎকর্ষতা বৃদ্ধি পায় আমরা তাই নিঃসন্তান কোন নারীকে মাতৃত্বের ঘাটতি হিসেবে কখনই ভাববো না পূর্ণাঙ্গ মাতৃত্ব সমৃদ্ধ নারীর মর্যাদাই তাঁর মর্যাদা

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন